হাজার মাসের চেয়েও উত্তম যে ‘রাত’

0

kodor1436824266

 

আজ দিবাগত রাত পবিত্র শবে কদর বা লাইলাতুল কদরের রাত। ‘হাজার মাসের চেয়েও উত্তম’ পবিত্র লাইলাতুল কদর সমগ্র মানবজাতির জন্য অত্যন্ত বরকতময় ও পূণ্যময় রজনী। পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ আল কোরআন লাইলাতুল কদরে নাজিল হয়। তাই মুসলিম উম্মাহ’র নিকট শবেকদরের গুরুত্ব ও ফজিলত অত্যধিক। এদিন ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য এবং এবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে দেশব্যাপি পবিত্র শবে কদর পালন করা হবে। প্রতিবছর মাহে রমজানের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে শবে কদর পালন করা হয়। ইসলাম ধর্ম অনুসারে এ রাতে মানবজাতির ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তাই মুসলমানদের কাছে এই রাত অত্যন্ত পূণ্যময় ও মহাসম্মানিত।

 

কদর অর্থ সম্মানিত, মহিমান্বিত। সুতরাং লাইলাতুল কদর-এর অর্থ সম্মানিত রজনী বা মহিমান্বিত রজনী। কদরের আরেক অর্থ হচ্ছে সংকীর্ণতা। এ হিসেবে লাইলাতুল কদর নামকরণ করা হচ্ছে, এ রাতে সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত ঊর্ধ্বগত থেকে পৃথিবীর বুকে এত বেশি কল্যাণ ও বরকত অবতীর্ণ হয়, যা ভূপৃষ্ঠে সংকুলান হয় না। কদরের আরেক অর্থ তাকদির ও আদেশ। এ রাতে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত তাকদির ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের হায়াত, রিজিক, ইত্যাদির পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাকে লিখে দেওয়া হয়।

 

শবে কদর উদযাপন উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মঙ্গলবার ওয়াজ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানী ও সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মসজিদেও বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হবে।

 

এই পবিত্র রজনী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও শবে কদর উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। এ উপলক্ষে আগামী বুধবার সরকারি ছুটি থাকবে।

 

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে পবিত্র লাইলাতুল কদরে জাতির অব্যাহত কল্যাণ ও সমৃদ্ধিসহ সকলের শান্তিময় ও পরিপূর্ণ জীবন কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনে হাজার মাসের চেয়েও বেশি ইবাদতের নেকি লাভের সুযোগ এনে দেয় এই রাত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সারারাত ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকেন। আল্লাহর অশেষ রহমত ও নিয়ামত আমাদের ওপর বর্ষিত হোক।’

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পবিত্র রজনীতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও মুসলিম জাহানের উত্তরোত্তর উন্নতি, অব্যাহত শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সিয়াম সাধনার মাস রমজানের এক মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর। এই রাতে মানবজাতির পথ নির্দেশক পবিত্র আল-কোরআন পৃথিবীতে নাজিল হয়। পবিত্র কোরআনের শিক্ষা আমাদের পার্থিব সুখ-শান্তির পাশাপাশি আখিরাতের মুক্তির পথ দেখায়। পবিত্র এ রাতে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। অর্জন করতে পারি তার অসীম রহমত, বরকত ও মাগফেরাত।’

 

মহিমান্বিত এ রাত সর্ম্পকে হাদিস শরীফে অসংখ্য ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এমনকি কোরআন শরীফে সুরা কদর নামে স্বতন্ত্র একটি পূর্ণ সুরা নাজিল হয়েছে। এই সুরাতেই শবে কদরের রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী নবী এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারণে বহু বছর আল্লাহর ইবাদাত করার সুযোগ পেতেন। সাহাবায় কেরামগণের এ আক্ষেপের প্রেক্ষিতে চিন্তা দূর করার জন্য সুরাটি নাজিল হয়।

 

আল্লাহ কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’ (সূরা আল- কদর, আয়াত ১-৫)

 

কদরের রাত্রের অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ঘোষণা করেছেন, ‘হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।’ (সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ১-৪)

 

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট একদল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (মাযহারি)

 

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুফতি মিজানুর রহমান কাসেমী এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন- শবে কদর রাত সম্বন্ধে সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে মতভেদ চলে আসছে। এ প্রসঙ্গে প্রায় ৪০টি বক্তব্য আছে। মুসলিম শরিফে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, শবে কদর হলো রমজানের ২৭তম রাত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত আবদল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত আছে।

 

কোরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে শবে কদর রমজান মাসে আসে; কিন্তু এর সঠিক কোনো তারিখ নির্দিষ্ট নেই। বুখারি ও মুসলিম বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলো শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। হাদিসের আলোকে আরো জানা যায়, রাসুল (সা.)-কে যখন এর তারিখ ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত এতে তোমাদের কল্যাণ নিহিত আছে। অর্থাৎ যদি এ রাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো তবে অনেক অলস প্রকৃতির মানুষ শুধু এ রাতে ইবাদত বন্দেগিতে নিয়োজিত হতো। দ্বিতীয়ত, এ রাত নির্দিষ্ট করা হলে কোনো ব্যক্তি ঘটনাক্রমে রাতটিতে ইবাদত করতে না পারলে সে দুঃখ ও আক্ষেপে পতিত হবে। এতে সে মাহে রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এ রাত যেহেতু নির্দিষ্ট করা হয়নি, সে জন্য এ রাতের সন্ধানে আল্লাহর সব বান্দা প্রতি রাতে ইবাদত বন্দেগি করে থাকে এবং প্রত্যেক রাতের জন্য পৃথক পৃথক পুণ্য অর্জন করতে থাকে।

 

কোরআন মাজিদ শবে কদরে অবতীর্ণ হয়:‘নিশ্চয় আমি কদর রাতে কোরআন নাজিল করেছি।’ এ আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায়, শবে কদরে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। লাওহে মাহফুজ থেকে শবে কদরে এই কোরআন অবতীর্ণ হয়। এরপর হজরত জিবরাইল (আ.) ধীরে ধীরে ২৩ বছরে তা রাসুল (সা.)-এর কাছে পৌঁছাতে থাকেন। এ কথাও বলা যেতে পারে, এ রাতে কয়েকটি আয়াত অবতরণের মাধ্যমে কোরআন অবতরণের ধারাবাহিকতা সূচনা হয়। এরপর অবশিষ্ট কোরআন পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়।

 

ইমাম মালিক (রহ.) সূত্রে বর্ণিত আছে, যখন রাসুল (সা.) কে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেওয়া হলো যে আপনার উম্মতের বয়স অন্যান্য উম্মতের তুলনায় কম হবে, তখন তিনি আল্লাহর সমীপে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ! তাহলে তো পূর্ববর্তী উম্মত দীর্ঘ জীবন পেয়ে ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে যে স্তরে উপনীত হয়েছে, আমার উম্মত সে স্তর লাভ করতে পারবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে লাইলাতুল কদর দান করেন এবং এটাকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা দেন।

 

ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও ইমাম তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাতকে রমজানের শেষ ১০ রাতের কোনো বেজোড় রাতে খোঁজ কর’। হযরত আবু বকর (রা.), ও হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকেও এ একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। সম্ভবত কোনো একটি কল্যাণকর কারণেই মহিমান্বিত এ রাতটিকে মহান আল্লাহ্ রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লুকিয়ে রেখেছেন।

 

মুসনাদে আহমেদ গ্রন্থে হযরত ওবায়দা ইবনে সামেত বর্ণিত হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে- ‘নবী করীম (সা.) বলেছেন- কদরের রাত রমজান মাসের শেষ দশ রাতে রয়েছে। যে ব্যক্তি উহার শুভফল লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আল্লাহ্ তার আগের পিছনের গুণাহ মাফ করে দিবেন।’

 

আসুন আমরা লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য লাভের আশায় ইবাদতে মশগুল হই। আমরা এতে অবহেলা করলে হাদিসের ভাষায় হতভাগ্য হিসেবে চিহ্নিত হব। রাসুল (সা.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত হতে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক আর কেউ বঞ্চিত হয় না।’ (মিশকাত)

Comments

comments

Comments

comments

Comments

comments

Menu

Koreabashi